ধ্বনির পরিবর্তন, স্বরাগম, এককথায় প্রকাশ ও বাক্য চেনার উপায়
বাংলা ব্যাকরণের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ধ্বনি পরিবর্তন, স্বরাগম, বাক্য-সংকোচন এবং বাক্যের প্রকারভেদ—উদাহরণসহ সহজ ভাষায়।
বাটনে ক্লিক করলে ডাউনলোড শুরু হবে।
ধ্বনির পরিবর্তন
ধ্বনি পরিবর্তন বলতে শব্দের মূল ধ্বনিতে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনকে বোঝায়। এর ফলে উচ্চারণের সময় এক ধ্বনির জায়গায় অন্য ধ্বনি আসে, পরের ধ্বনি আগেই উচ্চারিত হয়, যুক্তাক্ষর ভেঙে যায়, মূল শব্দে বাড়তি ধ্বনি যুক্ত হয় কিংবা ধ্বনির ওলট-পালট ঘটে।
সব ভাষাতেই এ ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ধ্বনি পরিবর্তনের ফলে নতুন শব্দ তৈরি হয়। এই পরিবর্তনে রয়েছে নানা বৈচিত্র্য, আর ভাষার গতিশীলতা ও আধুনিকীকরণে এর গুরুত্ব অনেক।
- সত্য > সত্যি
- স্কুল > ইস্কুল
- কপাট > কবাট
সহজ কথায়, ধ্বনির পরিবর্তন মানে শব্দের উচ্চারণের পরিবর্তন।
ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ
আঞ্চলিকতা, দ্রুত কথা বলা, গুরুত্ব প্রদান, জিভের আলসেমি, অসাবধানতা, অনিচ্ছা, ত্রুটি এবং সহজে উচ্চারণ করার প্রবণতা—এসব কারণে ধ্বনির পরিবর্তন ঘটে। স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি উভয়ের ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তন হতে পারে।
ধ্বনি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া
ধ্বনি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া প্রধানত তিনভাবে হয়ে থাকে:
- স্বরাগম
- স্বরলোপ / সম্প্রকর্ষ
- ধ্বনির রূপান্তর
স্বরাগম
স্বরাগম শব্দের অর্থ স্বর + আগম। উচ্চারণের সুবিধা বা অন্য কোনো কারণে শব্দের আদি, মধ্য বা অন্তে স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে স্বরাগম বলে।
- স্টেশন > ইস্টিশন
- রাত > রাইত
- সত্য > সত্যি
এই তিনটি উদাহরণে তিন রকম স্বরের আগমন দেখা যায়। সুতরাং স্বরাগম তিন প্রকার:
ক) আদি স্বরাগম
শব্দের শুরুতে স্বরধ্বনি আসে।
খ) মধ্য স্বরাগম
বিপ্রকর্ষ বা স্বরভক্তি—শব্দের মাঝখানে স্বরধ্বনি আসে।
গ) অন্ত্য স্বরাগম
শব্দের শেষে স্বরধ্বনি আসে।
আদি স্বরাগম (Prothesis)
উচ্চারণের সুবিধার জন্য বা অন্য কোনো কারণে শব্দের আদিতে (শুরুতে) স্বরধ্বনি এলে তাকে আদি স্বরাগম (Prothesis) বলা হয়। যেমন—
- স্কুল > ইস্কুল
- স্টেশন > ইস্টিশন
- স্পৃহা > আম্পৃহা
- স্ত্রী > ইস্ত্রি
- স্তাবল > আস্তাবল
- স্পর্ধা > আস্পর্ধা
মধ্য স্বরাগম বা বিপ্রকর্ষ বা স্বরভক্তি (Anaptyxis / Vowel insertion)
উচ্চারণের সুবিধার জন্য সময় সময় সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির মাঝখানে স্বরধ্বনি আসে। একে বলা হয় মধ্য স্বরাগম বা বিপ্রকর্ষ বা স্বরভক্তি (Anaptyxis)।
সহজভাবে বলা যায়, চলিত ভাষায় সহজে উচ্চারণের জন্য সংযুক্ত ব্যঞ্জনকে ভেঙে তার মাঝে স্বরধ্বনি আনয়নের রীতিকে স্বরভক্তি, বিপ্রকর্ষ বা মধ্যস্বরাগম বলে।
স্বরভক্তিতে অ, ই, উ, এ, ও—এই স্বরধ্বনিগুলোর আগম দেখা যায়। যেমন—
- রত্ন > রতন
- স্নান > সিনান
- মুক্তা > মুকুতা
- গ্রাম > গেরাম
অন্ত্য স্বরাগম
উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দের শেষে স্বরধ্বনি যুক্ত হলে তাকে অন্ত্য স্বরাগম বলে। যেমন—
- সত্য > সত্যি
বাক্য-সংকোচন বা সংক্ষেপণ / এককথায় প্রকাশ
একাধিক শব্দ বা একটি পূর্ণ বাক্যের ভাবকে একটি মাত্র শব্দে প্রকাশ করার নামই বাক্য-সংকোচন বা এককথায় প্রকাশ। নিচে অ ও আ বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া বাক্যাংশগুলোর তালিকা দেওয়া হলো। নির্দিষ্ট শব্দ খুঁজতে নিচের বাক্সে লিখুন।
| বাক্যাংশ | এককথায় প্রকাশ |
|---|---|
| অন্বেষণ করবার ইচ্ছা | অন্বেষা |
| অনুসন্ধানের ইচ্ছা / অনুসন্ধান করার ইচ্ছা | অনুসন্ধিৎসা |
| অল্প কথা বলে যে | অল্পভাষী |
| অশ্বের চালক | সাদি |
| অতিক্রমের যোগ্য | অতিক্রমণীয় |
| অক্ষির সমীপে | সমক্ষ |
| অক্ষির অগোচরে | পরোক্ষ |
| অক্ষিপত্রের (চোখের পাতা) লোম | অক্ষিপক্ষ্ম |
| অক্ষিতে কাম যার (যে নারীর) | কামাক্ষী |
| অক্ষির অভিমুখে / অক্ষির সমক্ষে বর্তমান | প্রত্যক্ষ |
| অনুকরণ করার ইচ্ছা | অনুচিকীর্ষা |
| আজন্ম শত্রু | জাতশত্রু |
| অতি আসন্ন | প্রত্যাসন্ন |
| অতি উচ্চ ধ্বনি | মহানাদ |
| অগ্রে গমন করে যে | অগ্রগামী |
| আশাভঙ্গজনিত খেদ | বিষাদ |
| অতি উচ্চ রোল | উতরোল |
| অনেকের মধ্যে একজন | অন্যতম |
| আরাধনার যোগ্য যিনি | আরাধ্য |
| আকালের বছর | দুবছর |
| আকাশে (খ-তে) চরে যে | খেচর / খচর |
| আকাশে যে বিচরণ করে | নভশ্চর |
| আকাশে (খ-তে) ওড়ে যে বাজি | খ-ধূপ |
| আকাশ ও পৃথিবী বা স্বর্গ ও মর্ত্য | ক্রন্দসী |
| আকাশ স্পর্শ করে যা | আকাশস্পর্শী |
| আনন্দজনক ধ্বনি | নন্দিঘোষ |
| অশ্বের ডাক | হেষা |
| অপে (জলে) জন্মে যা | অজ |
| অপকার করার ইচ্ছা | অপচিকীর্ষা |
| আনন্দের আতিশয্যে সৃষ্ট কোলাহল | হররা |
| অল্পকাল স্থায়িত্ব যার | ক্ষণস্থায়ী |
| অতিক্রম করা যায় না যা | অনতিক্রম্য, অনতিক্রমণীয় |
| আবক্ষ জলে নেমে স্নান | অবগাহন |
| অকালে পক্ব হয়েছে যা | অকালপক্ব |
| অতি উচ্চ বিকট হাসি | অট্টহাস্য |
| আয়নায় দেখা মূর্তি | প্রতিবিম্ব |
| অতিশয় রমণীয় | সুরম্য |
| আমার সদৃশ | মাদৃশ |
কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি।
বাক্য চেনার উপায়
বাক্য হলো একগুচ্ছ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত, বক্তার মনের ভাব প্রকাশক পদসমষ্টি। অর্থাৎ যে সুবিন্যস্ত পদ বা পদসমষ্টি দ্বারা বক্তার মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়, তাকে বাক্য বলে।
এককথায় বাক্য হলো পদের সমষ্টি। তবে শুধু পদের সমষ্টি হলেই বাক্য হয় না; বাক্য হতে হলে বক্তার মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পেতে হবে।
- আমি প্রতিদিন বিকালে মাঠে খেলতে যাই।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, কোনো ভাষায় যে উক্তির সার্থকতা রয়েছে এবং গঠনের দিক দিয়ে যা স্বয়ংসম্পূর্ণ, সেসব একক উক্তিকে ব্যাকরণের ভাষায় বাক্য বলে।
গঠন অনুসারে বাক্যের প্রকারভেদ
গঠন অনুসারে বাক্য তিন প্রকার:
১. সরল বাক্য
একটি কর্তা ও একটি সমাপিকা ক্রিয়া।
২. যৌগিক বাক্য
একাধিক বাক্য সংযোজক অব্যয়ে যুক্ত।
৩. জটিল বা মিশ্র বাক্য
প্রধান খণ্ড-বাক্যের সঙ্গে আশ্রিত খণ্ড-বাক্য।
সরল বাক্য
যে বাক্যে একটি মাত্র কর্তা এবং একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া থাকে, তাকে সরল বাক্য বলে।
- আমি ভাত খাই।
সরল বাক্য চেনার উপায়
- একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া থাকবে। যেমন: “আমি ভাত খাই।” এখানে “খাই” ছাড়া আর কোনো ক্রিয়া নেই। তাই একটি সমাপিকা ক্রিয়া দেখলেই বুঝতে হবে এটি সরল বাক্য।
- কর্তা না-ও থাকতে পারে। যেমন: “এসো এসো আমার কাছে এসো।” এখানে কর্তা উপস্থিত নেই, তবু এটি সরল বাক্য।
- অনেকগুলো অসমাপিকা ক্রিয়া থাকতে পারে। যেমন: “আকাশ বাড়ি এসে, সারাদিন ঘুরে ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে, খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল।” এখানে অনেকগুলো অসমাপিকা ক্রিয়া থাকলেও সমাপিকা ক্রিয়া একটিই (পড়ল), তাই এটি সরল বাক্য।
যৌগিক বাক্য
দুই বা তার বেশি সরল বা জটিল বাক্য একত্রিত হয়ে যে একটি সম্পূর্ণ বাক্য গঠন করে, তাকে যৌগিক বাক্য বলে। এসব বাক্যের মধ্যে সাধারণত এবং, ও, কিন্তু, অথবা, অথচ, তারপর, সুতরাং, কিংবা, বরং, তথাপি, নতুবা, যদ্যপি ইত্যাদি সংযোজক অব্যয় থাকে।
- তুমি অপরাধ করেছ, সুতরাং তোমার শাস্তি হবে।
যৌগিক বাক্য চেনার উপায়
দুটি বা তার বেশি বাক্য যদি এবং, ও, কিন্তু, অথবা, অথচ, কিংবা, বরং, তথাপি, তারপর, সুতরাং, নতুবা, যদ্যপি ইত্যাদি দ্বারা যুক্ত থাকে, তাহলে সেটি যৌগিক বাক্য।
- দুঃখ এবং বিপদ একই সাথে আসে।
জটিল বা মিশ্র বাক্য
জটিল বাক্যের অপর নাম মিশ্র বাক্য। যে বাক্যে একটি প্রধান খণ্ড-বাক্যের সঙ্গে এক বা একাধিক আশ্রিত খণ্ড-বাক্য পরস্পর যুক্ত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্য গঠন করে, তাকে জটিল বাক্য বা মিশ্র বাক্য বলে।
- যদি তুমি আসো, আমি যাব।
- যে ব্যক্তি কষ্ট করে, সে ব্যক্তি শান্তি লাভ করে।
জটিল বা মিশ্র বাক্য চেনার উপায়
- জটিল বাক্যের আদ্য অক্ষর সাধারণত ‘য’ দিয়ে শুরু হয়। কোনো বাক্যের শুরুতে ‘য’ থাকলে সেটি জটিল বাক্য হিসেবে চেনা যায়। যেমন: “ঠিক আছে, আপনি যখন বলছেন, বিষয়টি আমি দেখব।”
- জটিল বাক্যে সাধারণত দুটি সমাপিকা ক্রিয়া থাকে। যেমন: “যখন তুমি আসবে, তখন আমি যাব।”
এভাবে আমরা বাক্য দেখেই বুঝতে পারি সেটি কোন ধরনের বাক্য।


Thank You