ধ্বনি ও বর্ণ
ধ্বনি
ভাষার মূল উপাদান হচ্ছে ধ্বনি। মানুষের বাক-প্রত্যঙ্গ অর্থাৎ কণ্ঠনালী, মুখবিবর, জিহ্বা, আল-জিহ্বা, কোমল তালু, দাঁত মাড়ি, চোয়াল, ঠোঁট, নাক, ফুসফুস ইত্যাদির সাহায্যে উচ্চারিত আওয়াজকে ধ্বনি বলা হয়। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ধ্বনির সংখ্যা ৪১ টি।
বর্ণ
বর্ণ হচ্ছে ধ্বনি নির্দেশক প্রতীক, অর্থাৎ ধ্বনি নির্দেশক চিহ্নকে বলা হয় বর্ণ। একটি ধ্বনিতে একটি প্রতীক বা বর্ণ থাকে। “ধ্বনি দিয়ে আঁট বাঁধা শব্দেরই ভাষার ইট।” এখানে ইট হচ্ছে বর্ণ।
মাত্রার উপর ভিত্তি করে বর্ণ তিন প্রকার
| বর্ণ | সংখ্যা | স্বরবর্ণ | ব্যঞ্জনবর্ণ | মাত্রাহীন বর্ণ |
|---|---|---|---|---|
| স্বরবর্ণ | ১০ টি | ৪ টি (এ, ঐ, ও, ঔ) | - | ৬ টি (ঙ, ঞ, ৎ, ং, ঃ, ঁ) |
| অর্ধমাত্রার বর্ণ | ৮ টি | ১ টি (ঋ) | - | ৭ টি (খ, গ, ণ, থ, ধ, প, শ) |
| পূর্ণমাত্রার বর্ণ | ৩২ টি | ৬ টি (অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ) | ২৬ টি | - |
বর্ণমালা
যে কোনো ভাষায় ব্যবহৃত লিখিত বর্ণসমষ্টিকে সে ভাষার বর্ণমালা বলা হয়। বাংলা বর্ণমালায় মোট পঞ্চাশ (৫০) টি বর্ণ রয়েছে। তাঁর মধ্যে এগার (১১) টি স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ ঊনচল্লিশ (৩৯) টি। আধুনিক বাংলা ভাষায় মোট ৪৫ টি বর্ণের পূর্ণ রূপ ব্যবহৃত হয়।
| প্রকার | বর্ণ | মোট |
|---|---|---|
| স্বরবর্ণ | অ আ ই ঈ উ ঊ ঋ এ ঐ ও ঔ | ১১ টি |
| ব্যঞ্জনবর্ণ | ক খ গ ঘ ঙ | ৫ টি |
| চ ছ জ ঝ ঞ | ৫ টি | |
| ট ঠ ড ঢ ণ | ৫ টি | |
| ত থ দ ধ ন | ৫ টি | |
| প ফ ব ভ ম | ৫ টি | |
| য র ল | ৩ টি | |
| শ ষ স হ | ৪ টি | |
| ড় ঢ় য় ৎ | ৩ টি | |
| ং ঃ ঁ | ||
| সর্বমোট | ৫০ টি | |
অক্ষর
এক প্রয়াসে উচ্চারিত ধ্বনি বা ধ্বনি সমষ্টিকে অক্ষর (Syllable) বলে। যেমন - বন+ধন= বন্ধন। এখানে বন এবং ধন দুটি অক্ষর। পক্ষান্তরে, ব-ন ধ-ন এগুলো অক্ষর নয় বর্ণ বা হরফ।
ধ্বনির পরিবর্তন
শব্দের মূল ধ্বনির যে সব পরিবর্তন ঘটে তাই ধ্বনি পরিবর্তন। এর ফলে উচ্চারণের সময় এক ধ্বনির জায়গায় অন্য ধ্বনি আসে, পরের ধ্বনিকে আগেই উচ্চারণ করা হয়, যুক্তাক্ষর ভেঙ্গে দেওয়া হয়, মূল শব্দে বাড়তি ধ্বনি আনা হয়, ধ্বনির ওলট-পালট ঘটে। সব ভাষাতেই এ ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ধ্বনি পরিবর্তনের ফলে নতুন শব্দ তৈরি হয়।
ধ্বনির পরিবর্তন মানে শব্দের উচ্চারণ পরিবর্তন। মনে রাখতে হবে, ধ্বনি পরিবর্তনে কখনো অর্থের পরিবর্তন হবে না।
ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ
- আঞ্চলিকতা
- দ্রুত কথা বলা
- গুরুত্ব প্রদান
- জিভের আলসেমি
- অসাবধানতা
- অনিচ্ছা
- ত্রুটি
- সহজে উচ্চারণ করার প্রবণতা ইত্যাদি
ধ্বনি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া প্রধানত তিন ভাবে হয়ে থাকে:
- ✔ স্বরাগম
- ✔ স্বরলোপ/সম্প্রকর্ষ
- ✔ ধ্বনির রূপান্তর
স্বরাগম
স্বরাগম শব্দের মানে স্বর+আগম। উচ্চারণের সুবিধা বা অন্য কোন কারণে শব্দের আদি, মধ্য, অন্তে স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে স্বরাগম বলে।
সুতরাং, স্বরাগম তিন প্রকার:
- (ক) আদি স্বরাগম
- (খ) মধ্য স্বরাগম বিপ্রকর্ষ/ স্বরভক্তি
- (গ) অন্ত্য স্বরাগম
আদি স্বরাগম (Prothesis)
উচ্চারণের সুবিধার জন্য বা অন্য কোনো কারণে শব্দের আদিতে /শুরুতে স্বরধ্বনি এলে তাকে আদি স্বরাগম (Prothesis) বলা হয়।
স্টেশন > ইস্টিশন
স্পৃহা > আম্পৃহা
স্ত্রী > ইস্ত্রি
স্তাবল > আস্তাবল
স্পর্ধা > আস্পর্ধা
মধ্য স্বরাগম বা বিপ্রকর্ষ বা স্বরভক্তি (Anaptyxis)
উচ্চারণের সুবিধার জন্য সময় সময় সংযুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনির মাঝখানে স্বরধ্বনি আসে। একে বলা হয় মধ্য স্বরাগম বা বিপ্রকর্ষ বা স্বরভক্তি (Anaptyxis)।
স্বরভক্তিতে অ, ই, উ, এ, ও স্বরধ্বনির আগম দেখা যায়।
| স্বরধ্বনি | উদাহরণ |
|---|---|
| অ - | নির্জন > নিরজন, রত্ন > রতন, স্নেহ > ইস্নেহ, শক্তি > শকতি, মর্ম > মরম, সূর্য > সুরুজ, দর্শন > দরশন, প্রাণ > পরান, ধর্ম > ধরম, হর্ষ > হরষ, বর্ষিল > বরষিল, স্বপ্ন > স্বপন, জন্ম > জনম, ভক্তি > ভকতি, লগ্ন > লগন ইত্যাদি। |
| ই - | প্রীতি > পিরীতি, ক্লিপ > কিলিপ, বর্ষণ > বরিষন, ফিল্ম > ফিলিম, ত্রিশ > তিরিশ ইত্যাদি। |
| এ - | গ্রাম > গেরাম, প্রেক > পেরেক, স্রেফ > সেরেফ ইত্যাদি। |
| উ - | মুক্তা > মুকুতা, তুর্ক > তুরুক, ভ্রু > ভুরু, দুর্জন > দূরুজন, ধ্যান > ধেয়ান, ব্যাকুল > বেয়াকুল, প্রায় > পেরায়, ঘ্রাণ > ঘেরান, ব্ল্যাক > বেল্যাক, শুক্রবার > শুক্কুরবার ইত্যাদি। |
| ও - | চন্দ্র > চন্দোর, শ্লোক > শোলোক, মিত্র > মিত্তির, মুরগ > মুরোগ > মোরগ, কুর্ক > কোরোক ইত্যাদি। |
অন্ত্যস্বরাগম (Apotheosis)
শব্দের শেষে কোনো কোনো সময় অতিরিক্ত স্বরধ্বনি আসে। এরূপ স্বরের আগমনকে অন্ত্যস্বরাগম বলা হয়।
পোখ > পোক্ত
দুষ্ট > দুষ্টু
বেঞ্চ > বেঞ্চি
সত্য > সত্যি ইত্যাদি।
অপিনিহিতি (Epenthesis)
শব্দে ব্যঞ্জনের সঙ্গে যদি ই (আজি > আইজ) বা উ (চালু > চাউল) যুক্ত থাকে এবং সেই ই বা উ নিজের জায়গায় উচ্চারিত না হয়ে উক্ত ব্যঞ্জনের আগে উচ্চারিত হয়, তাকে অপিনিহিতি বলে।
রাখিয়া > রাইখ্যা
চলিয়া > চইল্যা
বাক্য > বাইক্য
কন্যা > কইন্যা
ভাসিয়া > ভাইস্যা
সত্য > সইত্য
কাব্য > কাইব্য
জালিয়া > জাইল্যা
চারি > চাইর
গদ্য > গইদ্য
রাতি > রাইত
মারি > মাইর
কাল > কাইল
আশু > আউশ
সাধু > সাউধ
গাছুয়া > গাউছ্যা
মাছুয়া > মাউছ্যা ইত্যাদি।
ক্ষ ও জ্ঞ-এর অন্তর্নিহিত ই-ধ্বনির অপিনিহিতি: সাক্ষাৎ > সাইকখাৎ, লক্ষ > লইকখ, বক্ষ > বইকখ ইত্যাদি।
অসমীকরণ (Dissimilation)
অসমীকরণ হলো একই স্বরের পুনরাবৃত্তি দূর করার জন্য মাঝখানে স্বরধ্বনি যুক্ত করা।
পট + পট > পটাপট
গপ + গপ > গপাগপ
টপ + টপ > টপাটপ ইত্যাদি।
স্বরসঙ্গতি (Vowel Harmony)
যদি একটি স্বরধ্বনির প্রভাবে শব্দে অপর স্বরের পরিবর্তন ঘটে তাকে স্বরসঙ্গতি বলে।
দেশি > দিশি
বিলাতি > বিলিতি
মুলা > মুলো ইত্যাদি।
স্বরসঙ্গতি পাঁচ প্রকারের হয়ে থাকে:
- (ক) প্রগত (Progressive)
- (খ) পরাগত (Regressive)
- (গ) মধ্যগত (Mutual)
- (ঘ) অন্যোন্য স্বরসঙ্গতি (Reciprocal)
- (ঙ) চলিত বাংলায় স্বরসঙ্গতি
সম্প্রকর্ষ বা স্বরলোপ
দ্রুত উচ্চারণের জন্য শব্দের আদি, অন্ত্য বা মধ্যবর্তী কোনো স্বরধ্বনির লোপ হয়।
জানালা > জান্লা ইত্যাদি।
ধ্বনি বিপর্যয়
শব্দের মধ্যে দুটি ব্যঞ্জনের পরস্পর পরিবর্তন ঘটে।
জাপানি রিক্সা > বাংলা রিস্কা
তলোয়ার > তরোয়াল
পিশাচ > পিচাশ
লাফ > ফাল।
সমীভবন বা সমীকরণ (Assimilation)
শব্দমধ্যস্থ দুটি ভিন্ন ধ্বনি একে অপরের প্রভাবে অল্প-বিস্তর সমতা লাভ করে।
কাঁদনা > কান্না
বিল্ব > বিল্ল
গল্প > গল্প
কুৎসিত > কুচ্ছিত ইত্যাদি।
বিষমীভবন (Dissimilation)
দুটো সমবর্ণের একটির পরিবর্তন ঘটে।
লাঙ্গাল > নাঙ্গল
লেবু > নেবু
তরবার > তরোয়াল
লাল > নাল ইত্যাদি।
দ্বিত্ত্ব ব্যঞ্জন (Long Consonant)
জোর দেয়ার জন্য শব্দের অন্তর্গত ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব উচ্চারণ হয়।
মুলুক > মুল্লুক
বড় > বড্ড
ছোট > ছোট্ট
সকাল > সক্কাল
কিছু > কিচ্ছু ইত্যাদি।
ব্যঞ্জন বিকৃতি
শব্দ-মধ্যে কোনো কোনো সময় কোনো ব্যঞ্জন পরিবর্তিত হয়ে নতুন ব্যঞ্জনধ্বনি ব্যবহৃত হয়।
ধোবা > ধোপা
শাক > শাগ
ধাইমা > দাইমা ইত্যাদি।
অন্তর্হতি
ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ পায়।
ফলাহার > ফলার
আলাহিদা > আলাদা ইত্যাদি।
অভিশ্রুতি (Umlaut)
বিপর্যস্ত স্বরধ্বনি পূর্ববর্তী স্বরধ্বনির সাথে মিলে গেলে এবং তদনুসারে পরবর্তী স্বরধ্বনির পরিবর্তন ঘটলে তাকে অভিশ্রুতি বলা হয়।
বলিয়া > বলে
হাটুয়া > হাউটা > হেটো
মাছুয়া > মেছো ইত্যাদি।
র-কার লোপ
আধুনিক চলিত বাংলায় অনেক ক্ষেত্রে র-কার লোপ পায় এবং পরবর্তী ব্যঞ্জন দ্বিত্ব হয়।
করতে > কত্তে
মারল > মাল্ল
করলাম > কল্লাম।
নাসিক্যীভবন (Nasalization)
নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনি ঙ (ং), ঞ, ণ, ন, ম লোপ পাওয়ার ফলে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনি সানুনাসিক হলে, পরিবর্তনজনিত এই প্রক্রিয়ার নাম নাসিক্যীভবন।
ঘোষীভবন, অঘোষীভবন, মহাপ্রাণীভবন, অল্পপ্রাণীভবন
- ঘোষীভবন (Voicing): অঘোষধ্বনিকে ঘোষধ্বনি → কাক > কাগ
- অঘোষীভবন (De-voicing): ঘোষধ্বনিকে অঘোষ → গুলাব > গোলাপ
- মহাপ্রাণীভবন (Aspiration): অল্পপ্রাণ → মহাপ্রাণ → পাশ > ফাঁস
- অল্পপ্রাণীভবন (De-aspiration): মহাপ্রাণ → অল্পপ্রাণ → ভগিনী > বোন
লোকনিরুক্তি
অপরিচিত শব্দ লোকমুখে পরিচিত শব্দের সাদৃশ্য পেয়ে যে পরিবর্তন ঘটে তাকে লোকনিরুক্তি বলে।
লোক-ব্যুৎপত্তি
প্রচলিত কোনো শব্দের সাদৃশ্য বা উক্তির প্রভাবে দেশি বা বিদেশি শব্দকে অনুরূপ করে উচ্চারণ করাকে লোক-ব্যুৎপত্তি বলে।
ধ্বনির পরিবর্তন : মডেল প্রশ্ন
প্রশ্ন: কোন রীতিতে 'স্নান' শব্দটি সিনান (স্নান > সিনান) শব্দে পরিণত হয়?
উত্তর: স্বরাগম
প্রশ্ন: গ্রাম > গেরাম- এখানে কোনটি ঘটেছে?
উত্তর: স্বরাগম
প্রশ্ন: রত্ন > রতন হওয়ার ধ্বনিসূত্র-
উত্তর: স্বরভক্তি



Thank You