বাংলা সাহিত্য সম্ভার

Raisul Islam Hridoy 0

বাংলা ভাষা এবং লিপি

বাংলার আদি অধিবাসীদের ভাষা ছিল অস্ট্রিক এবং আর্যদের ভাষার নাম ছিল প্রাচীন বৈদিক ভাষা।

ভাষা উদ্ভব সংক্রান্ত মতবাদ

  • সাধারণ মতে: খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়।
  • ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে: খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়।
ভাষাবিদ মূল উৎস ভাষা
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মাগধী প্রাকৃত
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ গৌড়ী প্রাকৃত

দশম থেকে চতুর্দশ শতাব্দীকে বাংলা ভাষার আদিস্তরের স্থিতিকাল ধরা হয়। বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এই ভাষাগোষ্ঠীর মোট শাখা দুইটি: কেন্তম এবং শতম।

লিপি ও বর্ণমালা

ভারতীয় লিপিমালা মোট দুইটি: ব্রাহ্মী লিপি এবং খরোষ্ঠী লিপি। আধুনিক বাংলা লিপি এবং বর্ণমালার উদ্ভব হয়েছে এই ব্রাহ্মী লিপি হতে।


বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে প্রধানত তিনটি যুগে ভাগ করা হয়েছে:

  1. আদিযুগ: ৬৫০ - ১২০০ খ্রীষ্টাব্দ
  2. মধ্যযুগ: ১২০১ - ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দ
  3. আধুনিক যুগ: ১৮০১ খ্রীষ্টাব্দ - বর্তমান
দ্রষ্টব্য: রাজনৈতিক ইতিহাসের মতো নির্দিষ্ট সালতারিখ অনুযায়ী সাহিত্যের ইতিহাসের যুগ বিভাজন করা সবসময় সম্ভব নয়। সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্য, বৈশিষ্ট্য এবং বিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করেই এই যুগবিভাগ করা হয়ে থাকে।

চর্যাপদ: পাল ও সেন আমলে রচিত সাহিত্যের আদি নিদর্শন

চর্যাপদ রচনার প্রেক্ষাপট ও আবিষ্কার

১৮৮২ সালে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র 'The Sanskrit Buddhist Literature in Nepal' গ্রন্থে কিছু পুঁথির পরিচয় দেন। এটি দেখে উৎসাহিত হন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (যিনি ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন)।

তিনি ১৯০৭ সালে দ্বিতীয়বার নেপাল গমন করেন এবং নেপালের রয়্যাল লাইব্রেরি থেকে একসাথে ৪টি গ্রন্থ আবিষ্কার করেন:

  1. চর্যাপদ (বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন)
  2. সরহপদের দোহা (অপভ্রংশ ভাষা)
  3. কৃষ্ণপদের দোহা (অপভ্রংশ ভাষা)
  4. ডাকার্ণব (অপভ্রংশ ভাষা)

১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এই ৪টি গ্রন্থ একত্রে "হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষার বৌদ্ধ গান ও দোহা" নামে প্রকাশিত হয়।

গবেষণা ও স্বীকৃতি

  • সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯২৬): তাঁর 'ODBL' গ্রন্থে ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণ করেন চর্যাপদ বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন।
  • ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৯২৭): ধর্মতত্ত্ব বিষয়ক গবেষণার মাধ্যমে একে বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

চর্যাপদের নামকরণ ও পদসংখ্যা

চর্যাপদের বিভিন্ন নাম পাওয়া যায়: আশ্চর্যচর্যচয়, চর্যাচর্য বিনিশ্চয়, চর্যাশ্চর্য বিনিশ্চয়, চর্যাগীতি কোষ ইত্যাদি।

মোট পদ: ৫১টি
আবিষ্কৃত পদ: ৪৬.৫টি (২৩ নং পদের অর্ধেক ও ২৪, ২৫, ৪৮ নং পদ পাওয়া যায়নি)
মোট কবি: ২৪ জন
পদ পাওয়া গেছে: ২৩ জনের

পদকর্তা বা কবিদের পরিচয়

কবিদের নামের শেষে 'পা' যোগ করার কারণ হলো সম্মানসূচক 'পাদ' শব্দ। এরা ছিলেন বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মের সাধক বা সিদ্ধাচার্য।

কবির নাম পদসংখ্যা বিশেষ বৈশিষ্ট্য
লুইপা ২টি চর্যাপদের আদিকবি।
কাহ্নপা ১৩টি সর্বাধিক পদ রচয়িতা (১২টি উদ্ধারকৃত)।
ভুসুকপা ৮টি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদকর্তা; নিজেকে 'বাঙালি' দাবি করেছেন।
সরহপা ৪টি অন্যতম প্রধান সিদ্ধাচার্য।
কুক্কুরীপা ২টি তাঁকে মহিলা কবি হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
শবরীপা ২টি বাঙালি কবি হিসেবে পরিচিত (ভাগীরথী তীরের বাসিন্দা)।
তন্ত্রীপা ০ তাঁর ২৫ নং পদটি পাওয়া যায়নি।

সামাজিক চিত্র ও ঢেন্ডনপা

চর্যাপদে তৎকালীন সমাজের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় ঢেন্ডনপা-র পদে। তাঁর পদে বেদে দল, বিয়ের উৎসব, গয়না চুরি এবং সাধারণ মানুষের অভাব-অনটনের (ভাতের অভাব) কথা ফুটে উঠেছে। তিনি পেশায় ছিলেন একজন তাঁতি।

উল্লেখযোগ্য আরও কবিগণ:

  • লাড়ীডোম্বীপা
  • বিরূপা
  • কুম্বলাম্বরপা
  • কঙ্ককপা
  • গুন্ডরীপা
  • শান্তিপা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

New Posts

সমাজসেবা অধিদপ্তর নিয়োগ সহায়িকা

সমাজসেবা অধিদপ্তর নিয়োগ সহায়িকা - বাংলাদেশের নদ-নদী ও ভূ-প্রকৃতি সমাজসেবা অধিদপ্তর নিয়োগ সহায়ি...